বাড়ি জাতীয় প্রসবে সিজার কমাতে মনিটরিং সেল

প্রসবে সিজার কমাতে মনিটরিং সেল

139

প্রসবে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন কমাতে এবার মনিটরিং সেল হচ্ছে চট্টগ্রামে। গাইনোকোলজিস্টদের সংগঠন অবট্রিটিক্যাল এন্ড গাইনোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) চট্টগ্রাম শাখা প্রথমবারের মতো এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ও বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার সহায়তায় এ মনিটরিং সেল গঠন করা হবে।

গাইনোকোলজিস্টদের বিরুদ্ধে প্রসবে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের বিস্তর অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে মনিটরিং সেল গঠনের এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ওজিএসবি চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের গাইনী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহেনা আক্তার। তিনি আজাদীকে বলেন, প্রয়োজন না থাকলেও প্রসবে সিজারিয়ান অপারেশন করা হয় বলে আমাদের গাইনোকোলজিস্টদের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ বলতে গেলে মানুষের মুখে মুখে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতেই মূলত মনিটরিং সেল গঠনের উদ্যোগ। বিএমএর সহায়তায় ও সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে এ মনিটরিং সেল গঠনের কথা জানিয়ে ডা. শাহেনা আক্তার বলেন, এ নিয়ে সিভিল সার্জনের সাথে আমাদের প্রাথমিক আলাপ হয়েছে। বিএমএ নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপের পর সভার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হবে। শহর ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা সকল গাইনী কনসালটেন্টদের সভায় আমন্ত্রণ জানানো হবে। সেখানেই মনিটরিং সেল গঠন করা হবে।

মনিটরিং সেলের দায়িত্ব বা কার্যক্রম সম্পর্কে ওজিএসবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে এ মনিটরিং সেল শহর ও উপজেলা পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করবে। আর অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান হয়ে থাকলে তা কেন হচ্ছে, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখবে ওই কমিটি (মনিটরিং সেল)।

এ বিষয়ে ওজিএসবির নেতৃবৃন্দের সাথে প্রাথমিক আলাপ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। বিএমএর নেতৃবৃৃন্দের সাথে আলাপের মাধ্যমে অক্টোবরের প্রথম দিকে এ সংক্রান্ত একটি সভা আহ্বানের কথা জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, গাইনী কনসালটেন্টদের পাশাপাশি উপজেলায় কর্মরত সকল (সার্জারি, মেডিসিন ও অ্যানেসথেসিয়া) কনসালটেন্টদের সভায় ডাকা হবে। সিজারিয়ান অপারেশনের বিষয়টি ছাড়াও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কনসালটেন্টদের উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হবে বলেও জানান সিভিল সার্জন।

উল্লেখ্য, নবজাতক জন্মদানের (প্রসবের) ক্ষেত্রে দেশে অস্ত্রোপচার (সিজারিয়ান অপারেশন) বৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনক। সামপ্রতিক বছরগুলোতে এই হার বেড়েছে ৫ গুণেরও বেশি। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক এন্ড হেলথ সার্ভে– ২০১৪ এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রসবে অস্ত্রোপচারের হার ২৩ শতাংশ। অথচ, ২০০৪ সালে এই হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। আর ২০০৭ ও ২০১১ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৯ ও ১৭ শতাংশ। ২০১৪ সালে এ জরিপ (সার্ভে) পরিচালনার পর ২০১৫ সালে এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)। নির্পোটের জরিপের তথ্য মতে, সারাদেশে মোট প্রসবের ৩৭ ভাগ প্রসব হয় হাসপাতাল বা ক্লিনিকে। আর এসব প্রসবের ৬০ ভাগই সিজারিয়ান (অস্ত্রোপচারে)। প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে মোট প্রসবের ৮০ ভাগই অস্ত্রোপচারের (সিজারিয়ান অপারেশনের) মাধ্যমে হয়ে থাকে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে সিজারিয়ান প্রসবের হার ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত হারের তুলনায় অনেক বেশি। এই সার্ভে রিপোর্টকে আদর্শ মান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিপোর্টের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন এনডিসি। ওই সময় তিনি দাবি করেন, স্ট্যান্ডার্ড প্রক্রিয়ায় এই জরিপ চালানো হয়েছে। তাই জরিপের ফলাফলও অবশ্যই যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য।

প্রসবে অস্ত্রোপচার বৃদ্ধির এই হারকে আশঙ্কাজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলেছেন, এর পেছনে ডাক্তারদের বাণিজ্যিক মানসকিতা তো রয়েছেই। পাশাপাশি মানুষের অতি আধুনিক মানসিকতাও এর জন্য সমান দায়ী। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাভাবিক প্রসব একটু সময়সাপেক্ষ। ডাক্তাররা এত বেশি ব্যস্ত যে, এই সময়টুকু দিতে চান না। তাঁরা অস্ত্রোপচারের জন্য প্রসূতির পরিবারকে এক প্রকার বাধ্য করান। প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে এই প্রবণতা খুব বেশি। তবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই হার তুলনামূলক কম। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রসূতির স্বাভাবিক প্রসবে আর কোন ধরনের সম্ভাবনা অবশিষ্ট না থাকলে তখনই শেষ উপায় হিসেবে অস্ত্রোপচারের (সিজারিয়ান অপারেশন) প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু এখন বলতে গেলে সিজারিয়ান অপারেশন গণহারে হচ্ছে। এর পেছনে ডাক্তারদের অতি বাণিজ্যিক মানসিকতার পাশাপাাশি প্রসূতির পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধারণের অক্ষমতাও দায়ী। যদিও শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে সিজারিয়ান অপারেশনের ঘটনা বেশি ঘটে বলে মনে করেন ওজিএসবি চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহেনা আক্তার। এদিকে, সিজারিয়ান অপারেশন কমিয়ে স্বাভাবিক ডেলিভারি বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে পরিবার–পরিকল্পনা অধিদফতর। স্বাভাবিক প্রসব সেবা প্রদানের লক্ষ্যে প্রান্তিক পর্যায়ে গড়ে তোলা হয়েছে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে ২৪/৭ (সার্বক্ষণিক) স্বাভাবিক প্রসব সেবা জোরদারে কয়েক বছর ধরে কাজ করছেন পরিবার–পরিকল্পনা অধিদফতরের পরিচালক (মা ও শিশু স্বাস্থ্য) ডা. মোহাম্মদ শরীফ। স্বাভাবিক প্রসব সেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সারাদেশের উপজেলা পর্যায়ে ওরিয়েন্টশন প্রোগ্রামের আয়োজন করছেন তিনি। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মীর পাশাপাশি স্থানীয় মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সরকারি দফতরের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকছেন এ প্রোগ্রামে। চট্টগ্রামের বেশকয়টি উপজেলাসহ সারাদেশে এ পর্যন্ত ১০৫টি উপজেলায় এ ওরিয়েন্টশন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়েছে।

স্থানীয় গাইনোকোলজিস্ট সংগঠনের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদককে প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ জানানো হয় জানিয়ে পরিবার–পরিকল্পনা অধিদফতরের পরিচালক (মা ও শিশু স্বাস্থ্য) ডা. মোহাম্মদ শরীফ বলেন, প্রতিটি প্রোগ্রামে গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটির নেতৃবৃন্দ অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনকে নিরুৎসাহিত করে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, সিজারিয়ান অপারেশনে আমরা ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে আছি। সেটি স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। এটি যে করেই হোক কমিয়ে আনতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের পক্ষ থেকে আমরা সে চেষ্টাই করছি।

প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডাক্তাররাই প্রসূতির পরিবারকে অস্ত্রোপচারের জন্য প্ররোচিত করেন বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ডা. সুশান্ত বড়ুয়া। তাঁর মতে, খুব কম সংখ্যক মানুষ ওই বিপদকালীন ডাক্তারদের কথা অগ্রাহ্য করার মতো দুঃসাহস দেখাতে পারেন। ডাক্তারদের এই অতি বাণিজ্যিক মানসিকতা মেডিকেল শিক্ষায় নৈতিকতা পরিপন্থী। আবার অনেক ক্ষেত্রে এর বিপরীত চিত্রও দেখা যায়। ফলে প্রসবে অস্ত্রোপচারের হার আশঙ্কাজনক ভাবে বাড়ছে। এর জন্য ডাক্তারদের পাশাপাশি মানুষের আধুনিক মানসিকতাও দায়ী বলে দাবি এই চিকিৎসকের।

তবে রোগীর স্বজন ও সংশ্লিষ্টদের দাবি বাড়তি আয়ের নেশায় পেয়ে বসেছে চিকিৎসকদের। স্বাভাবিক প্রসব হলে তো তেমন আয়ের সুযোগ নেই। কিন্তু অস্ত্রোপচারে আয় বেশি। তাছাড়া একটি রোগী নিয়ে পড়ে থাকতে চান না চিকিৎসকরা। অন্য ক্লিনিকে আরো একাধিক রোগীর জন্য ছুটে যেতে হয় তাঁদের। ফলে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা গাইনী চিকিৎসকদের পক্ষে সম্ভব নয়। যার কারণে সময় বাঁচাতে সিজারিয়ান অপারেশনেই বেশি আগ্রহী হন চিকিৎসকরা  21.09.2018