বাড়ি হালিশহর চটপটি বিক্রেতা থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চটপটি বিক্রেতা থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

527

কেফায়েতুল্লাহ কায়সার:
সুলতানা আক্তার বৃষ্টি। পিতা- মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন। পিতা-পেশায় একজন দারোয়ান। মাতা একজন চটপটি বিক্রেতা। বৃষ্টির বয়স সবে মাত্র ৫ পেরিয়েছে। এই বয়স থেকেই সকালে ঘুম থেকে ওঠে বৃষ্টি মায়ের সাথে চটপটি বিক্রিতে যুক্ত হতো। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলত এই ব্যবসা।
চট্টগ্রাম নগরির হালিশহর বি-ব্লক ট্রেড স্কুলে বেড়ে ওঠে বৃষ্টি। অসচেতন পরিবারের সন্তান বৃষ্টির কোন স্বপ্ন নেই। আসলে সে এখন স্বপ্ন বুঝেই বা কী। অশিক্ষিত পিতা-মাতারও তাদের সন্তান বৃষ্টিকে নিয়ে কোন আশা-স্বপ্ন নেই। বাবা দারোয়ান। পুরাদিন থাকেন তার কর্মস্থলে। সন্তানদের নিয়ে তার এত চিন্তা বা স্বপ্নও কখনো মাথায় আসেনি। মাস শেষে দারোয়ানের চাকরি করে যে টাকা পান তাতে চলেনা তার সংসার। তাকে সহযোগিতা করতে তার স্ত্রী শুরু করেন চটপটির ব্যবসা। ট্রেড স্কুলের সামনে শুরু হয় এই চটপটি বিক্রি।
তিন সন্তানকে লালন-পালন সহ মা একার পক্ষে রাস্তার পাশে রোদে বসে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই ব্যবসা চালিয়ে যেতে বেশ হিমশিমে পড়তেন। বাধ্য হয়ে ৫ বছেরের বৃৃষ্টিকে যুক্ত করেন তার ব্যবসায়। বৃষ্টি চটপটি বিক্রি করত আর এই ফাঁকে মা সেরে নিতেন বাসার অন্য কাজগুলো।
ইতিমধ্যে হালিশহর ট্রেড স্কুল ক্যাম্পে শিক্ষানুরাগী সোহেল আক্তার খান বৃষ্টিদের মত ছেলে-মেয়েদের কথা চিন্তা করে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘নীড প্রাইমারী স্কুল’ পরবর্তীতে তা ওব্যাট প্রাইমারী স্কুল নাম করণ করা হয়। আর এলাকার স্বপ্নহীন পিতা-মাতাদের অনুপ্রেণা দিলেন, তারা যেন এখন থেকে তাদের ছোট শিশুদের কাজে না লাগিয়ে এবং শিশু শ্রমে যুক্ত না করে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠান। অনেকে সাড়া দিলেন সোহেল আক্তার খানের ডাকে। বৃষ্টির পিতা-মাতাও এলেন সেই আহবানে।
বৃষ্টি এখন ‘নীড প্রাইমারী স্কুলে’র শিক্ষার্থী। ভর্তি হলো শিশু শ্রেণিতে। চটপটি ব্যবসায়ী বৃষ্টি এখন পড়াশুনা করছে।
কিন্তু ব্যবসা? না চটপটি ব্যবসা বৃষ্টি ছাড়তে পারছেনা। সে চটপটি বিক্রি বন্ধ করে দিলে তার পরিবার আর্থিক সংকটে পড়বে। তাই সকাল থেকে স্কুলের সময় পর্যন্ত বৃষ্টি চটপটি বিক্রি করে। আর স্কুলের সময় হলে স্কুলে চলে যায়। এভাবে স্কুল শেষে বৃষ্টি আবার ব্যস্ত হয়ে যায় তার চটপটি ব্যবসা নিয়ে।
স্কুল সময়ের পর পুরাদিন বৃষ্টির সময় কাটে মায়ের সাথে চটপটি নিয়ে। পড়াশোনার মূল্য বুঝার বয়স বৃষ্টির এখনো হয়নি। তার পিতা-মাতারও এতকিছু মাথায় কাজ করেনা। স্কুলের বাই-খাতা কলম শুধু স্কুলে যাওয়ার জন্য। স্কুলের পর বই-খাতা এত কিছুর সাথে সম্পর্ক থাকে না বৃষ্টির।
২০০৯ সাল। বৃষ্টি এখন ৫ম শ্রেণিতে পড়ছে। সরকারী ঘোষণা এলো ৫ম শ্রেণিতে এখন থেকে বোর্ড কর্তৃক সমাপনী পরীক্ষা হবে। বৃষ্টি যথারীতি পরীক্ষা দিল কিন্তু দুই সাবজেক্টে ফেল করে অকৃতকার্য হলো।
হোচট খেল বৃষ্টি। সোহেল আক্তার খান উৎসাহ দিলেন বৃষ্টিকে। বৃষ্টির এখন কিছুটা উপলব্ধি শুরু হলো। সে এখন পড়াশুনার মর্ম বুঝতে শুরু করেছে। না এভাবে হেরে গেলে চলবেনা। সে সিদ্ধান্ত নিল। আবার সমাপনী পরীক্ষা দিল। এবার বৃষ্টি প্রথম বিভাগে পাশ করল।
বেড়ে গেল বৃষ্টির উৎসাহ। ভর্তি হলো ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পি এইচ আমিন স্কুলে। এ-গ্রেডে জেএসসি পাশ করল। একইভাবে এসএসসি পাশ করল পিএইচ আমিন স্কুল থেকে এ-গ্রেডে।
এক রুমের ছোট্ট একটি জীর্ণশীর্ণ ঘর। যেখানে রান্না সেখানে ঘুম। আবার সেখানে চলে বৃষ্টির পড়াশুনা। দেওয়ালের চামড়া মাঝে মধ্যে খসে পড়ে মাথায়। চারদিকে বস্তি। চেঁচামেচি, হৈচৈ আরো নানান সমস্যার মাঝেই বেড়ে উঠছে বৃষ্টি।
এসএসসির পর সরকারী কমার্স কলেজে ভর্তির সুযোগ হলো। শুরু হলো বৃষ্টির নতুন করে স্বপ্ন দেখা।
বৃষ্টির পিতার সংসারে এখনো সুদিন ফিরেনি। তাই বৃষ্টি এখনো চটপটি বিক্রি করছে। কমার্স কলেজে পড়াকালীন তাকে বেশিই পরিশ্রম করতে হয়েছে। সে জীবনকে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। তাই তাকে ভালো ফলাফলের জন্য বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে।
ভালো ফলাফলের জন্য তাকে বাইরে কোচিং-প্রাইভেট পড়তে হয়। এত খরচ তার বাবার পক্ষে করা সম্ভব নয়। ওব্যাট তাকে সহযোগিতা করেছে। তবুও দরিদ্র পরিবার বলে আর্থিক একটা সংকট তো থাকে।
বৃষ্টি সকালে চটপটি বিক্রি করে। এর পর কলেজে যায়। আর কলেজ থেকে এসে নিজে প্রাইভেট পড়ে এবং কিছু শিক্ষার্থীও সে প্রাইভেট পড়াই। ১৭ বছরের বৃষ্টি এখন অনেক সচেতন। তার এখন স্বপ্ন সে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করবে। সেই পথেই চলছে এখন বৃষ্টি।
এত কষ্ট করে পড়াশুনা করা নিয়ে বৃষ্টির নিকট জানতে চাইলে বৃষ্টি বললেন, ‘খুবই সমস্যা হয় তবুও চটপটি বিক্রি ও পড়াশুনা তাকে এক সাথে করে যেতে হচ্ছে।’ পারিবারিক সংকটের কারণে চটপটি বিক্রি করেন বৃষ্টি। আর উন্নত জীবনের জন্য পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছেন। দু’টো কাজ এক সাথে কষ্ট হলেও নিয়তিকে মেনে নিয়ে এসব চালিয়ে যাচ্ছেন বৃষ্টি।
ওব্যাট হেলপারস এর কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর সোহেল আক্তার খান বলেন, ‘বৃষ্টিকে আমি চটপটির দোকান থেকে তার পিতা-মাতাকে বুঝিয়ে স্কুলে ভর্তি করালাম। অসচেতন ও দরিদ্র পরিবার হওয়ায় নানা প্রতিকূলতা ছিল। এখনও আছে। কিন্তু আমি তাকে ও তার পরিবারকে বার বার উৎসাহ দিয়েছি যেন পড়াশুনা চালিয়ে যায়। সাধ্যমত ‘ওব্যাট’ সহযোগিতা করেছে। সে কথা রেখেছে। হাল ছাড়েনি। তার সুফলও সে ও তার পরিবার এখন ভোগ করবে।’
এত প্রতিকূলতার মাঝেও বৃষ্টি এখন নিজের জীবনের সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সকল সমস্যাকে জয় করে ভালো ফলাফল করে পাশ করল এইচএসসি। প্রস্তুতি নিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য। গত তিনদিন আগে ৯১.৪৭ নম্বর পেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের জায়গা করে নিল বৃষ্টি। তার কৃতিত্বের জন্য সে ওব্যাটের নিকটও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
বৃষ্টি এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার পিতা দারোয়ান। সে ও তার মাতা এখনও চটপটি বিক্রি করেন। এই চটপটি বিক্রি চলছে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে। তার বন্ধুরা এসব বিষয় নিয়ে তাকে তিরস্কার করে। এত কিছুতে কান দেয়না বৃষ্টি। বাবা দারোয়ান এটা তার পেশা। এতে যে যাই বলুক বৃষ্টি এসব কিছুতে লজ্জা পাইনা। তার খারাপও লাগেনা। পিতার সংসারকে এগিয়ে নিতে পিতাকে একটু সহযোগিতা করতে সে এখন পেশাগত চটপটি বিক্রেতা। এই চটপটি বিক্রি করে যেই টাকা লাভ হয় তাতে মোটামোটি তার পিতার সহযোগিতা হয়।
তার মাথায় এখন নানা স্বপ্ন। অনেক পরিকল্পনা। সে বিসিএস ক্যাডার হবে। একটি ভালো চাকরিতে ঢুকবে। বাবার পরিবারের হাল ধরবে। ছোট দুই বোনদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। মা বাবাকে কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি দেবে। একটি সুন্দর পরিবার গড়বে। #