বাড়ি শিক্ষা শিক্ষা সেবায় বদলে যাওয়া উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষা সেবায় বদলে যাওয়া উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

163

প্রতিষ্ঠার ২৬ বছরে উপনীত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংখ্যার বিবেচনায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যা উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণ শিক্ষা ব্যবস্থানির্ভর একটি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রযুক্তির নানামুখী ব্যবহার করে শিক্ষা বিস্তরণে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় দেশজুড়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ১২ আঞ্চলিক কেন্দ্র ৮০ উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং ১৫০০-এর অধিক স্টাডি সেন্টারে ৫১টি শিক্ষা প্রোগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান রয়েছে। সার্টিফিকেট লেভেল থেকে শুরু করে এমফিল, পিএইচডি পর্যন্ত শিক্ষাদান করছে বিশ্ববিদ্যালয়। সাশ্রয়ী অর্থে শিক্ষার্থীরা সময়মতো পড়ালেখার মধ্য দিয়ে এখানে তাদের কোর্স সমাপ্তি করতে পারে। চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা করে কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ করে দিয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। সে জন্য দেশের লাখো শিক্ষার্থীর প্রিয় প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯৯২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। গাজীপুরে ৩৫ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে এর মূল ক্যাম্পাস। লাল সিরামিক ইটের সুদৃশ্য ভবন, সবুজ বৃক্ষরাজী, দীর্ঘ নারিকেল গাছের সারি, প্রকৃতির সজীবতা দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাসে সহজেই সবার মন কাড়ে। বিশালকায় প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘স্বাধীনতার চিরন্তন’।

স্কুল অব এডুকেশন, সামাজিক বিজ্ঞান মানবিক ও ভাষা স্কুল, ওপেন স্কুল, স্কুল অব বিজনেস, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন স্কুল এবং স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এই ৬টি স্কুলের অধীনে ৫১টি শিক্ষা প্রোগ্রামের একাডেমিক পাঠ তৈরির কাজ, শিক্ষক, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি, মডিউল্যারভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক তৈরিসহ শিক্ষাসংক্রান্ত সমুদয় কাজে নিয়ত রয়েছেন ১৩৫ জন নিয়মিত শিক্ষক। পাশাপাশি স্টাডি সেন্টারে রয়েছে ২৬,৮০০-এর অধিক অ্যাডজাঙ্কট টিউটর তথা শিক্ষক। যারা মাসে দুই শুক্রবার স্টাডি সেন্টারগুলোতে নিয়মিত পাঠদান করছে। অনার্স ও মাস্টার্স প্রোগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে নিয়মিত পাঠদান, পরীক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রে তরুণ, বয়স্ক, নারী তথা পুরুষ নানা বয়সের শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে শুক্রবার ও শনিবার দিনগুলোতে এ ছাড়াও দেশজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুক্রবার এলেই বাউবির শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণের মিলনমেলা বসে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কার্যালয়ে ১১টি প্রশাসনিক বিভাগ ১টি ই-লার্নিং সেন্টার ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে রয়েছে মিডিয়া বিভাগ, কম্পিউটার বিভাগ, প্রকাশনা মুদ্রণ ও বিতরণ বিভাগ এবং স্টুডেন্ট সাপোর্ট সার্ভিসেস বিভাগ। মিডিয়া বিভাগ টেলিভিশন ও বেতার অনুষ্ঠান তৈরি এবং প্রকাশনা মুদ্রণ ও বিতরণ বিভাগ পাঠ্যপুস্তক তৈরি এবং বিতরণ করে থাকে। স্টুডেন্ট সাপোর্ট সাভিসেস বিভাগ শিক্ষার্থী সেবায় নিয়োজিত।

সব বয়সের, সব পেশার নারী ও পুরুষ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শিখে কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে পাঠ শেষে স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা পেশায় সার্থকতা, কৃষি শিক্ষায় শিক্ষা লাভ করে পেশাগত দক্ষতা বাড়িয়ে এখানকার শিক্ষার্থীরা জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখছে। একইভাবে অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীরাও কর্মক্ষেত্রে সফলতা দেখাচ্ছে।

১৯৯২ থেকে ২০১৮, ছাব্বিশ বছর। প্রযুক্তির স্পর্শে বদলে গেছে বর্তমানে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ণ প্রযুক্তিবান্ধব এখন এ বিশ্ববিদ্যালয়। অনলাইনে ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, ফি প্রদান, পরীক্ষার ফল প্রকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে গতিময়তা এনেছে আর এতে শিক্ষার্থীদের সময় ও অর্থ দুটিরই অনেক সাশ্রয় হয়েছে। সহজেই সব তথ্য আহরণে ও বিস্তরণে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম ত্বরান্বিত হয়েছে। ভার্চুয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার পথে তাই এখন এ বিশ্ববিদ্যালয়।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অনার্স ও মাস্টার্স লেভেলের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন এখানে ক্লাস করতে হয় না। নিজের পাঠ নিজেরাই শিক্ষার্থীরা পড়ছে। পাশাপাশি রয়েছে টিউটোরিয়াল, রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পাঠদান। শিক্ষক মেন্টর হিসেবে সর্বদা পাশেই রয়েছে। অ্যাসাইনমেন্ট, থিসিস নিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও করছে। অনার্স ও মাস্টার্স প্রোগ্রামে শিক্ষকরা নিয়মিতভাবে পাঠদানে আঞ্চলিক কেন্দ্রে ক্লাস নিচ্ছেন। কৃষি শিক্ষায় একাধিক বিষয়ে এমএস প্রোগ্রাম চালু হয়েছে। ইতোমধ্যে দু’টি আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপিত হয়েছে।

সম্প্রতি চালু হয়েছে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন আলট্রা সাউন্ড প্রোগ্রাম। মাস্টার্স ইন ডিজএবিলিটি ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী হতে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক ডাক্তার ও ফিজিওথেরাপিস্ট। অচিরেই চালু হতে যাচ্ছে ডিপ্লোমা ইন ফার্মেসি, প্রাইমারি হেল্থ কেয়ার, মাস্টার্স ইন সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল লাইভলিহুড, মাস্টার অব বিজনেস স্টাডিজ (এমবিএস), পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা-ইন-হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (পিজিডিএইচআরএম), পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা-ইন-সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট (পিজিডিএসসিএম)।

এসডিজি বাস্তবায়নে মানব সম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে এসেছে। যে সব প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোর্স বা প্রোগ্রাম চালু রয়েছে কেবল সেখানেই টিউটোরিয়াল সেন্টার খোলা হয়েছে। মাস্টার ইন পাবলিক হেল্থ বিষয়ে একটি নতুন প্রোগ্রাম চালু হয়েছে। সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এ প্রোগ্রামের ৮ (আট) টিউটোরিয়াল সেন্টার চালু হয়েছে। ভাষা শিক্ষা কোর্সের মধ্যে চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ প্রোগ্রাম চালু হয়েছে। চীনের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক সহযোগিতার ফলে এ প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ গ্রহণে উৎসাহ দেখা দিয়েছে। ই-লার্নিং সেন্টারেও নিয়মিতভাবে শিক্ষকদের ই-এডুকেশনে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ওপেন এডুকেশন রিসোর্স সেন্টারের মাধ্যমে দূর পাঠে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ওপর গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গবেষণার জন্য যেখানে ফেলোশিপ প্রদান করা হচ্ছে। এমফিল, পিএইচডি প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হয়েছে। ফলে প্রথাগত ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের একমাত্র আশ্রয়স্থল উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়- এ ধারণা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।

২০১৭-১৮ শিক্ষা বর্ষে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছয় লাখেরও অধিক অথচ ৬টি স্কুলে মাত্র ১৩৫ জন শিক্ষক। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষাদান নিশ্চিত করায় ৫১টি প্রোগ্রামের শিক্ষাদান সম্ভব হচ্ছে। চলতি বছরে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৫ জন শুধু বিএ/বিএসএস পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। ৬০ দিনের মধ্যে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হচ্ছে। সময়মতো পাঠসামগ্রী প্রদানে এখন বিশ্ববিদ্যালয় অনেক তৎপর। নিজস্ব দুটি পিকআপ ভ্যান, দুটি লরি ছাড়াও ডাক বিভাগের লরি দিয়ে ১০ লক্ষাধিক বিশাল বইয়ের বহর পৌঁছে যাচ্ছে শিক্ষার্থীর হাতে হাতে। পাশাপাশি রয়েছে ইন্টারনেট ই-বুক ব্যবহারের সুযোগ। ৪৮০টি বই ই-বুকে আপলোড করা রয়েছে। সময় করে শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করছে ওপেন এডুকেশন রিসোর্সের সুবিধা। বিটিভি ও বেতার অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ওয়েব রেডিও এবং ওয়েব টিভি ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণের প্রণোদনা বাড়িয়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহার করে মোবাইল সিম কার্ডে পড়ালেখারও সুযোগ সৃষ্টি করছে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। ইউটিউবে বাউবির শিক্ষা প্রোগ্রামগুলো খুবই জনপ্রিয়।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্পন্ন শিক্ষা দানে বদ্ধপরিকর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি প্রদানের লক্ষ্যে পাঠসামগ্রী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তৈরি ও মুদ্রণ করা হয়। অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের সহায়তায় পাঠসামগ্রীর মান যাচাই হয়ে থাকে। ফলে শিক্ষাদানে এ বিশ্ববিদ্যালয় গুণগত উৎকর্ষ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অধিকতর সচেতন। শিক্ষার্থীদের ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, কাউন্সিলিংয়ের জন্য রয়েছে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন কার্যালয়। আঞ্চলিক উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র ছাড়াও স্টাডি সেন্টারগুলোতে শিক্ষকরা শিক্ষা সেবা দিয়ে চলেছে।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এখন দেশজুড়ে সব শিক্ষার্থীর সাশ্রয়ী অর্থে পাঠ গ্রহণের অন্যতম একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতকোত্তরসহ আইন, ব্যবসা, কম্পিউটার, কৃষি, কৃষি শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, এমএস, এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষাদানের মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমান্বয়ে দেশে দক্ষ জনসম্পদ সৃজনে ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশজুড়ে বাউবি সে জন্যই সবার প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
– লেখক : পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়